আমিরুল ইসলাম খান আলীম এর
নির্বাচনী ইশতেহার

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম,
প্রিয় সিরাজগঞ্জ-০৫ (বেলকুচি, চৌহালী ও এনায়েতপুরবাসী), আসসালামু আলাইকুম।

সিরাজগঞ্জ—০৫ বাংলাদেশের এমন একটি জনপদ, যেখানে আছে শ্রমজীবী মানুষের ঘাম, নদীভাঙনের দীর্ঘশ্বাস, তাঁতশিল্পের ঐতিহ্য রক্ষার দীপ্ত শপথ এবং তরুণ সমাজের মাঝে অদম্য স্বপ্ন । কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো——এই সম্ভাবনাময় এলাকা দীর্ঘদিন ধরে যোগ্য নেতৃত্বের অভাবে অবহেলার শিকার। নদীভাঙনে চৌহালির মানুষ বারবার সর্বস্ব হারিয়েছে, কৃষক তার ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হয়েছে, তাঁতীরা জ্বালানি ও পুঁজি সংকটে পিছিয়ে পড়েছে, আর তরুণ সমাজ কর্মসংস্থানের অভাবে এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়েছে।

২০২৪ সালের ছাত্র–জনতার ঐতিহাসিক আন্দোলনে দীর্ঘ ১৭ বছরের ফ্যাসিস্ট শাসনের পতন হয়েছে। এই দীর্ঘ ১৭ বছরের স্বৈরাচারী দুঃশাসনে যারা শহীদ হয়েছেন, গুম-খুন ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন,তাদের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়েই বাংলাদেশ আজ গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও ভোটাধিকারের পথে ফিরতে যাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে বিএনপি ঘোষিত ৩১ দফা রাষ্ট্র সংস্কার রূপরেখা শুধু একটি রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি নয়-এটি একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গড়ার সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা।
আমি আমিরুল ইসলাম খান আলীম,আপনাদেরই একজন ।আপনাদের ভালোবাসা, শ্রদ্ধা, স্নেহ-শাসনই আমার রাজনীতির সবচেয়ে বড় শক্তি । আপনারা জানেন, আমি প্রাচ্যের অক্সফোর্ড ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগ থেকে অনার্স ও মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেছি। সমাজবিজ্ঞানের শিক্ষা আমার চিন্তাধারা ও দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রসারিত ও পরিপক্ব করে তোলে এবং সমাজ, রাষ্ট্র ও মানুষের কল্যাণে কাজ করার অনুপ্রেরণা জোগায়।আর সেই অনুপ্রেরণাই আমাকে মানুষের কল্যাণে ছাত্র রাজনীতির দিকে নিয়ে যায় ।

আপনারা জানেন, আমি ২০০২-২০০০৫ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক, সভাপতি ছিলাম। সেই সময়ে আমাদের নেতা জনাব তারেক রহমানের একটি বিখ্যাত শ্লোগান ছিলো- “ মেধার আলোতে বিকশিত হোক ছাত্র রাজনীতি ”। এই শ্লোগানটি ছিলো আমার অনুপ্রেরণা। পরবর্তীতে আমি ২০০৯ সালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হই। বর্তমানে আমি বিএনপি’র জাতীয় নির্বাহী কমিটির রাজশাহী বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক, সিরাজগঞ্জ জেলা বিএনপির সম্মেলন প্রস্তুত কমিটির আহবায়ক ও সিরাজগঞ্জ-০৫ আসনের একজন সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী।

আপনারা জানেন, ১৯৯০ এর স্বৈরাচার বিরোধী গণ-আন্দোলনে আমি সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের যুগ্ম-আহবায়ক ছিলাম এবং গুলিবিদ্ধ হয়ে ছিলাম। ১/১১ তে সেনাশাসন চলা অবস্থায় কারফিউ এর ভেতর মিছিল করেছি, প্রতিবাদ- প্রতিরোধের কারণে অত্যাচারিত হয়েছি। হাসিনা আমলে, বিগত ১৭ বছরে বহুবার জেল-জুলুম, পুলিশ রিমান্ড, হামলা, মামলা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছি। প্রায় শতাধিক মিথ্যা মামলার মুখোমুখি হয়েছি। আমি ও আমার পরিবারের উপর গুলি চালানো হয়েছে। তবু আমি আমার নীতি আদর্শ থেকে সরে যাইনি, গণতন্ত্রের লড়াইয়ে আপোষ করিনি ।

আপনারা জানেন, বেলকুচি, এনায়েতপুর ও চৌহালি এলাকা জুলাই-২৪ এ একটি গুরুত্বপূর্ণ রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিলো। বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের স্বৈরাচারিতার বিপরীতে ৭১ এর চেতনায় অনুপ্রাণিত হয়ে একটি স্বাধীন স্বার্বভৌম রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক জন-আকাঙ্ক্ষায় জুলাই-২৪ এর যে গণঅভ্যুত্থান সংঘঠিত হয়েছে; তা মূলত আমাদের সামনে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, বৈষম্যহীন, মানবিক সমাজ এবং জবাবদিহিতামূলক নাগরিক অধিকার আদায়ের সমাজ ব্যবস্থা তৈরির দ্বার উন্মোচন করেছে। এখন সময় এসেছে জনতা ও জনপ্রতিনিধিদের কাঁধে-কাঁধ মিলিয়ে নতুন আধুনিক, গণতান্ত্রিক ও সমতাভিত্তিক জনবান্ধব সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থা গড়ে তোলার ।

যেহেতু আমি নিজে একজন গণতান্ত্রিক লড়াইয়ের সংগ্রামী ছাত্র নেতা ছিলাম তাই তরুন সমাজের প্রতি আমার অগাধ আস্থা ও বিশ্বাস রয়েছে। আমি বিশ্বাস করি, আজকের তরুন সমাজই আগামির ভবিষ্যৎ। তাই প্রবীণদের অভিজ্ঞতা ও অনুপ্রেরণার আলোকে, আমি এই তরুন ছাত্র-সমাজ কে সাথে নিয়েই আগামীর সিরাজগঞ্জ-০৫ আসনের উন্নয়নে কাজ করে যেতে চাই । আপনাদের একটি সুন্দর বেলকুচি, এনায়েতপুর ও চৌহালি উপহার দিতে চাই ।

এই ইশতেহারের মূল ভিত্তি হলো- গণতন্ত্র, ভোটাধিকার, আইনের শাসন ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি স্থানীয় সমস্যা গুলো চিহ্নিত করে স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ গ্রহণ করা এবং তরুণ, নারী ও প্রান্তিক মানুষের ক্ষমতায়ন করা।
আমি বিশ্বাস করি, বিএনপি’র ৩১ দফার ভেতরেই নিহিত আছে গণতন্ত্র, ভোটাধিকার, আইনের শাসন ও আত্মনির্ভরশীল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মূলমন্ত্র। আমাদের সিরাজগঞ্জ-০৫ আসনের মূল সমস্যাগুলোকে চিহ্নিত করা এবং ৩১ দফার ভিত্তিতে সমস্যার সমাধানই হবে আমার মূল লক্ষ্য। যেমনঃ

১. নদীভাঙন রোধ ও চৌহালীর স্থায়ী সমাধানঃ চৌহালীর মানুষের সবচেয়ে বড় সংকট যমুনা নদীভাঙন ৷ আমার অঙ্গীকার— তিস্তা প্রকল্পের আদলে যমুনা নদীর দুই পাড়ে স্থায়ী ও টেকসই বাঁধ নির্মাণ করা এবং নদীর দুই পাড়ে মাটি ভরাট করে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পুনর্বাসন করা এবং কৃষিভিত্তিক ক্ষুদ্র কুটির শিল্প স্থাপন করে মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা ।

২. কৃষি ও কৃষক কল্যাণঃ বেলকুচি,চৌহালি,এনায়েতপুরের কৃষকদের ভাগ্য উন্নয়নের লক্ষ্যে “ কৃষক কার্ড বিতরণ করা এবং এই কৃষি কার্ডের মাধ্যমে কৃষকদের মাঝে উন্নত বীজ, সার ও কীটনাশক সরবরাহ করা। সরকারি ক্রয়কেন্দ্র স্থাপন করে কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা।কৃষকদের আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহারের জন্য কৃষকদের প্রশিক্ষণ দেয়া ও বিনামূল্যে কৃষকদের মধ্যে আধুনিক যন্ত্রপাতি সরবরাহের ব্যবস্থা করা। কৃষকদের কে কৃষি ঋণ থেকে মুক্তির ব্যবস্থা করা

৩. তাঁত শিল্প ও শিল্পায়নঃ এই এলাকা দেশের ঐতিহ্যবাহী তাঁত শিল্পের প্রাণকেন্দ্র। তাঁত শিল্পকে রক্ষার জন্য তাঁত ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করে স্বল্প সুদে তাঁতিদের ঋণের ব্যবস্থা করা। সয়দাবাদ থেকে এনায়েতপুর পর্যন্ত গ্যাস লাইন স্থাপন করে তাঁতিদের গ্যাস লাইন সংযোজন দেয়া হবে। গ্যাস লাইন সংযোগ দিলে তাঁতিরা গ্যাস ব্যবহার করে নতুন নতুন পণ্য উৎপাদন করে তাঁত শিল্প যেমন রক্ষা পাবে তেমনি তাঁতিদের অর্থনৈতিক গতিশীলতা বৃদ্ধি পাবে ।

৪. ইন্ড্রাস্টিয়াল পার্ক স্থাপন : বেলকুচিতে একটি ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক স্থাপন করা হবে। এই ইন্ড্রাস্টিয়াল পার্কের মধ্যে গার্মেন্টস ও কুটির শিল্প নির্মান করে ১০–১২ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হবে ।

৫. এডুকেশনাল পার্ক স্থাপনঃ এডুকেশনাল পার্কের মধ্যে বিজিএমইএ এর আদলে একটি টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ প্রতিষ্ঠা করা হবে। বিদেশে প্রশিক্ষিত কর্মী পাঠানোর লক্ষ্যে ম্যানপাওয়ার ট্রেনিং সেন্টার প্রতিষ্ঠা করা হবে এবং প্রতি বছর ১ হাজার কর্মীকে ট্রেনিং দিয়ে ব্যাংক ঋণের মাধ্যমে বিদেশে চাকরির ব্যবস্থা করা হবে।

৬. শিক্ষা ও সংস্কৃতিঃ সৃজনশীল ও উন্নত শিক্ষার পরিবেশ, ইংরেজি মাধ্যম কিন্ডারগার্টেন স্থাপন, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও কারিগরি শিক্ষার সম্প্রসারণ সহ স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসাগুলোতে শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও মানোন্নয়ন এবং পাঠাগার, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও মুক্তমঞ্চ স্থাপন করা ।

৭. স্বাস্থ্যসেবাঃ “ স্বাস্থ্য কার্ড ” চালু করা, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ৫০ শয্যা থেকে ১০০ শয্যায় উন্নীত করা হবে। বর্তমানে বাংলাদেশে ডায়াবেটিক মহামারি আকারে দেখা দিয়েছে। ডায়াবেটিক রোগিদের স্বল্প খরচে চিকিৎসা দেয়ার জন্য একটি ডায়াবেটিক সেন্টার প্রতিষ্ঠা করা হবে ।

৮. যানজট নিরসনে উদ্যোগ গ্রহণঃ সয়দাবাদ থেকে এনায়েতপুর পর্যন্ত সড়ক প্রশস্ত করা হবে। কেজির মোড় ও মুকুন্দগাতি এলাকায় যানজট নিরসনের লক্ষ্যে বাইপাস বা ফ্লাইওভার নির্মাণ করা হবে ।

৯. নারী, শিশু ও সামাজিক নিরাপত্তাঃ নারীদেরকে আত্মনির্ভরশীল করার জন্য “ ফ্যামিলি কার্ড ” প্রদান করা হবে। ইভটিজিং এর হাত থেকে নারী ও ছাত্রীদের নিরাপত্তার লক্ষ্যে একটি ডিজিটাল হটলাইন সেবাকেন্দ্র চালু করা হবে।

১০. সোহাগপুর হাট সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়নঃ সোহাগপুর হাট সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন করা হবে ও ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হবে।

১১. শহীদ পরিবারকে সহায়তা প্রদান : জুলাই আন্দোলনের আহত-নিহত পরিবারগুলোক আর্থিক সহায়তা প্রদান করা ও সরকারি চাকরির ব্যবস্থা করা হবে।

১২. উপজেলা প্রতিষ্ঠাঃ এনায়েতপুর থানাকে উপজেলা হিসাবে প্রতিষ্ঠা করা হবে ।

আমি অঙ্গীকার করছি, আমি সিরাজগঞ্জ-০৫ আসনে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলে এই আসনের মানুষের দুঃখ-কষ্ট ও চাহিদার কথা তুলে ধরবো। নাগরিক সেবা, নিরাপত্তা ও উন্নয়নে কাজ করবো,তরুণদের ভবিষ্যৎ গড়তে পাশে থাকবো এবং প্রবীণদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে তরুণদের নিয়ে ভবিষ্যতের উন্নয়নমুখী সিরাজগঞ্জ-০৫ গড়ে তুলবো ইনশাল্লাহ । আমি আপনাদের কাছে একটি কথাই বলতে চাই, ক্ষমতার আগে জনতা। আমি আপনাদের কাছে ক্ষমতা চাই না—আমি চাই আপনাদের কল্যাণে নিয়োজিত থাকতে ।

মনে রাখবেন, এই নির্বাচন শুধুমাত্র একজন প্রার্থী বাছাই নয়- এটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের ভোট। আপনার একটি ভোট- গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করবে, স্বৈরশাসনের পুনরাবৃত্তি ঠেকাবে এবং একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, সমতাভিত্তিক মানবিক সমাজ ও বৈষম্যহীন গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়তে সহায়তা
করবে।

ভোট আপনার, ভবিষ্যৎ আপনার।
মনে রাখবেন, “সবার আগে বাংলাদেশ।
আসুন, পরিবর্তনের পক্ষে দাঁড়াই।

১২ তারিখ সারাদিন, ধানের শীষে ভোট দিন।
আল্লাহ আমাদের সহায় হোন। বাংলাদেশ-জিন্দাবাদ ।